১৯ নভেম্বর২০১৮, ৫ অগ্রহায়ণ১৪২৫
1024x90-ad-apnar

প্রথমে চোর, তারপরে সুপারস্টার

Sunday, 28/06/2015 @ 12:45 pm

Ctg_ArrestBG1_banglanews24__248169810

চট্টগ্রাম অফিস: দলনেতার বয়স ১৭ থেকে ১৮। সেকেন্ড ইন কমান্ডের বয়স ১০। কর্মীদের বয়স ১০ থেকে ১৪। এই শিশু-কিশোরেরাই চট্টগ্রাম নগরীতে গড়ে তুলেছে সংঘবদ্ধ সাইকেল চোর চক্র। বিগত ছয় মাসে এরা নগরীতে প্রায় ১০০টি বাই সাইকেল চুরি করেছে।

চক্রের সেকেন্ড ইন কমান্ডসহ পাঁচজনকে কোতয়ালি থানা পুলিশ গ্রেপ্তার করতে সক্ষম হয়েছে।এদের কাছ থেকে পেয়েছে চুরির কৌশলসহ বিভিন্ন চাঞ্চল্যকর তথ্য।

পুলিশের মতে, নিয়ন্ত্রণ করতে না পারলে এই শিশুরাই হবে আগামী দিনের একেকজন তারকা সন্ত্রাসী।

কোতয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নেজাম উদ্দিন জানান, শেকল কেটে বাই সাইকেল কিংবা ব্যাটারিকশা চুরিতে এরা অত্যন্ত পারদর্শী।

চোখের সামনেই ত্বড়িৎ গতিতে শেকল কেটে সাইকেল নিয়ে তারা চম্পট দিতে সক্ষম। এরপর সেই সাইকেল এনে বিক্রি করে সদরঘাটের সাইকেল পার্টসের দোকানে।

পুলিশ চোরাই সাইকেল কেনার অপরাধে দু’জনকে গ্রেপ্তার করেছে। এরা হলেন সাইকেল মেলার মালিক সুজন আচার্য (২৭) ও সাইকেল মার্টের কর্মচারি সাইফুল (২৭)। সুজনের দেয়া তথ্যমতে পুলিশ নগরীর পাথরঘাটা আশরাফ আলী রোডের জাইল্যাপাড়ায় মুছা কলোনিতে অভিযান চালিয়ে ছয়টি চোরাই সাইকেল উদ্ধার করেছে।

গ্রেপ্তার হওয়া চোর চক্রের পাঁচজন হল, মো.হৃদয় (১০), মো.সাগর (১১), মো.জহির (১৩), মো.সাইয়িদ (১৩ বছর ৬ মাস) এবং মো.ইসমাইল (১৪)।

কোতয়ালি থানার এস আই মো.ইলিয়াছ জানান, শনিবার (২৭ জুন) রাত ৮টার দিকে নগরীর দিদার মার্কেট এলাকায় একটি সাইকেলের তালা ও শেকল কাটার সময় হৃদয়কে ধরে ফেলে পুলিশ ও স্থানীয় জনতা।এরপর তার দেয়া তথ্যমতে নগরীর দামপাড়া ও লালখানবাজার থেকে আরও চারজনকে আটক করা হয়। আটকের পর থানায় এনে তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।তাদের দেয়া তথ্যমতে সাইকেল দোকানের মালিক ও কর্মচারিকে আটক করা হয়েছে।

দলনেতা রনিকে গ্রেপ্তারের চেষ্টা চলছে বলে এস আই ইলিয়াছ জানান।

কোতয়ালি থানায় গিয়ে দেখা গেছে, চেহারায় এখনও নিষ্পাপ অভিব্যক্তি।একজন আরেকজনের সঙ্গে দুষ্টুমিতে ব্যস্ত।তারা জানায়, তাদের দলনেতা হচ্ছে রানা। রানা অটোরিক্সা চালায় এবং সাইকেল-ব্যাটারি রিকশা চুরি করে। আর হৃদয় সেকেন্ড ইন কমান্ড হিসেবে কাজ করে ।

হৃদয় জানায়, তাদের বাসা দামপাড়ায়। তার মা বাসায় কাজ করে। দুই ভাই এক বোনের মধ্যে সে সবার ছোট। বড় ভাই ওয়েল ফুডে চাকরি করে। খেলতে গিয়ে তার সঙ্গে রনি’র পরিচয়। কয়েক মাস আগে রনি তাকে চকবাজার ধুনিরপুল এলাকায় নিয়ে যায়। একটি বাসার নিচে নিয়ে গিয়ে তাকে একটি হ্যাক্সোব্লেড দেয়। বাসার নিচে একটি সাইকেল শেকল দিয়ে বাঁধা ছিল। প্রথমে রনি সেটা কাটতে শুরু করে। পরে হৃদয়কে কাটতে দেয়। তারপর হৃদয় নিজেই সাইকেলটি চালিয়ে সদরঘাটে আসে। সেখানে রনি, হৃদয় ও সাগর মিলে সাইকেলটি তিন হাজার টাকায় বিক্রি করে। সেখান থেকে হৃদয় ও সাগর পায় তিন’শ করে ছয়’শ টাকা।

সাগর জানায়, রনি সাইকেল চুরির জন্য প্রথমে হৃদয়কে ঠিক করে। হৃদয় সাগরকেও নিয়ে যায়। আটক হওয়া পাঁচজনের মধ্যে তিনজনই হৃদয়ের কথায় চোর চক্রে যোগ দিয়েছে।

হৃদয় জানায়, ‍দামপাড়ায় একটি স্কুলে দ্বিতীয় শ্রেণীর পর্যন্ত পড়ালেখা করেছে সে। এরপর তার মা তাকে একটি মাদ্রাসায় ভর্তি করে দিয়েছিল। সেখানে হুজুর বেশি পেটাত দেখে সে পালিয়ে চলে আসে। বাসায় তার দুষ্টুমিতে অতীষ্ঠ হয়ে তার মা তাকে পায়ে শেকল দিয়ে বেঁধে রোখত। সে শেকল কেটে বাসা থেকে বেরিয়ে চুরি করতে চলে যায়।

কোতয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নেজাম উদ্দিন বাংলানিউজকে বলেন, শেকল কাটার মধ্যে হৃদয়, সাগর এরা খুবই পারদর্শী। চোখের পলকে ব্লেড দিয়ে টিউব কেটে শেকল খুলে সাইকেল নিয়ে যায় তারা।

হৃদয় জানায়, সে এ পর্যন্ত ১৫টি সাইকেল চুরি করে সদরঘাটে এনে বিক্রি করেছে। সাগর জানায়, তার চুরির পরিমাণ কমপক্ষে ১২টা। তারা সপ্তাহে তিন থেকে চারটা বাই সাইকেল চুরি করে।

জহির জানায়, রনি’র নেতৃত্বে তারা সবাই মিলে কমপক্ষে ১০০ টা সাইকেল চুরি করেছে। একবার তারা একটি ব্যাটারি রিকশা চুরি করেছিল। কিন্তু কাগজপত্র না থাকায় তারা সেটি বিক্রি করতে পারেনি। এরপর আবার রিকশাটি আগের জায়গায় রেখে এসেছিল। এরপর থেকে রিকশা চুরি বাদ দিয়েছিল।

সাইয়িদ জানায়, সে দামপাড়া এলাকায় একটি মুরগির দোকানে চাকুরি করে। রনি এবং হৃদয়ের কথায় সে দু’বার সাইকেল চুরি করতে গিয়েছিল। দু’টি সাইকেল চুরি করে এনে সে সদরঘাটে বিক্রি করেছিল।

আর ইসমাইলের দাবি, সে সাবেক মন্ত্রী এম এ মান্নানের ছেলের বাসায় দারোয়ান হিসেবে কাজ করে। এলাকার কয়েকটা ছেলেকে পুলিশ ধরে নিয়েছে শুনে তাদের ছাড়াতে এসে সেও আটক হয়েছে।

তবে অন্যান্যদের দাবি, ইসমাইলও তাদের সঙ্গে সাইকেল চুরিতে জড়িত।

সাইয়িদ জানায়, একটি সাইকেল চুরি করে বিক্রি করতে পারলে তাদের তিন’শ টাকা করে দিত রনি।

‘টাকা পেলে প্রথমে ক্যান্ডিতে গিয়া বিরানি খাইতাম। তারপর মনে করেন ঠান্ডা-মান্ডা খাইয়া বাসায় চলে যেতাম। ’ বলেন সাইয়িদ।

সাইয়িদ ও সাগর জানায়, ১০ বছর বয়সী হৃদয় চুরির টাকায় মাসখানেক আগে একটি মোবাইল কিনেছিল। তাদের প্রত্যেকের মোবাইল আছে বলেও তারা ‍জানিয়েছে।

হৃদয় বলে, ‘২২০০ টাকা দিয়ে একটা পুরান টাচ স্ক্রিন মোবাইল নিছিলাম। পরে দেখি এটা ভেতরে খারাপ। এটা চার’শ টাকায় বিক্রি কইরা দিছি। পরে আরেকটা কিনছি। ’

তারা জানায়, রনি’র নেতৃত্বে থাকা এই চক্রে আরও কমপক্ষে ১০ থেকে ১৫ জন সদস্য আছে। লালখানবাজার, চকবাজার, দিদার মার্কেট, জামালখান প্রেসক্লাব, চৌমুহনী, দেওয়ানহাটসহ বিভিন্ন এলাকা থেকে তারা সাইকেল চুরি করে।

কোতয়ালি থানার পরিদর্শক (তদন্ত) নেজাম উদ্দিন বাংলানিউজকে জানান, যেহেতু তাদের বয়স কম, আমরা আইন অনুযায়ী সমাজসেবা অধিদপ্তর ও একটি এনজিও’র কর্মকর্তাদের ডেকেছি। তাদের সাক্ষী রেখে আমরা পাঁচজনকে পরিবারের কাছে হস্তান্তর করব। এরপর তাদের স্কুলে ভর্তি করিয়ে দেয়া হবে। সেখানে তারা ঠিকভাবে স্কুলে যাচ্ছে কিনা, লেখাপড়া করছে কিনা সেটা পুলিশ মনিটর করবে।

বাকি দু’জনের বিরুদ্ধে চোরাই সাইকেল কেনার অপরাধে মামলা হবে বলে তিনি জানান।