২৬ মার্চ২০১৯, ১২ চৈত্র১৪২৫
1024x90-ad-apnar

একুশে পদক-২০১৫ মনোনীতদের সংক্ষিপ্ত জীবন বৃত্তান্ত

Tuesday, 10/02/2015 @ 9:07 am

Untitled-1_11নজরুল ইসলাম: বিভিন্ন ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ অবদানের স্বীকৃতিস্বরূপ দেশের ১৫ জন বিশিষ্ট নাগরিককে ২০১৫ সালের একুশে পদক দিচ্ছে সরকার। এর মধ্যে দুই জনকে মরণোত্তর সম্মাননা দেয়া হচ্ছে।
রোববার তাদের নাম সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় থেকে প্রকাশ করা হয়। আগামী ১৯ ফেব্রুয়ারি প্রধানমন্ত্রী তাদের হাতে পদক তুলে দেবেন।
যারা একুশে পদক পাচ্ছেন তাদের সংক্ষিপ্ত পরিচিতি:-
পিয়ারু সরদার (মরণোত্তর): পিয়ারু সরদার ছিলেন ঢাকার ২২ পঞ্চায়েত প্রধানের মধ্যে অন্যতম একজন। ১৯১১ সালে তাঁর জন্ম। ১৭ বছর পঞ্চায়েত সরদারের দায়িত্ব পালন শেষে ১৯৬১ সালে ৫০ বছর বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেন। তিনি ঠিকাদারি ব্যবসা করবেন এবং ১৯৫২ সালে ঢাকা মেডিকেল কলেজ সম্প্রসারণ কাজের ঠিকাদার ছিলেন। এ কারণে সে সময় তিনি মেডিকেল কলেজ হোস্টেল এলাকায় প্রচুর ইট, বালু ইত্যাদি এনে রেখেছিলেন। ২১ ফেব্রুয়ারি গুলির পর শহীদদের স্মৃতি রক্ষার জন্য মেডিকেল কলেজ কম্পাউন্ডেই একটি শহীদ মিনার নির্মাণের সিদ্ধান্ত গৃহীত হয় ভাষা আন্দোলনের নেতৃস্থানীয় কর্মীদের দ্বারা। পিয়ারু সরদার তার ঠিকাদারি কাজের জন্য যে ইট, বালু এনে রেখেছিলেন, সেগুলো খোলা জায়গাতেই ছিল। কিন্তু সিমেন্ট ছিল গুদামে তালাবদ্ধ। ছাত্ররা তার কাছে সিমেন্টের জন্য অনুরোধ করার সঙ্গে সঙ্গে তিনি তাদের হাতে গুদামের চাবি দিয়ে বলেন, সিমেন্টসহ সবকিছু প্রয়োজনমতো ব্যবহার করতে এবং কাজ শেষ হলে চাবি তাকে ফেরত দিতে। জিনিসপত্র খোয়া যাওয়া থেকে নিয়ে সরকারের রোষানলে পড়ার আশঙ্কার কোনো হিসাব না করেই তিনি শহীদ মিনার নির্মাণের জন্য তার সাহায্যের হাত বাড়িয়েছিলেন। পরবর্তী সময়ে শহীদ মিনার একাধিকবার ভাংচুর হলেও ২৩ ফেব্রুয়ারি নির্মিত সেই শহীদ মিনারই ছিল শহীদদের স্মৃতি জাগরূক রাখার প্রথম প্রয়াস। পিয়ারু সরদারের সাহায্য ছাড়া তা নির্মাণ করা সম্ভব ছিল না।
অধ্যাপক মো. মজিবর রহমান দেবদাস: মজিবর রহমানের জন্ম ১৯২৮ সালে। জয়পুরহাটের মহুরুল গ্রামের এক দরিদ্র কৃষক পরিবারের সন্তান তিনি। বগুড়া আজিজুল হক কলেজ থেকে আইএসসি তে সেকেন্ড স্ট্যান্ড করেন।এরপর ভর্তি হন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৫২ সালে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে ফলিত গণিতে প্রথম শ্রেণীতে প্রথম স্থান অধিকার করেন। বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বেরিয়ে বগুড়া ও কুমিল্লায় দুটি কলেজে অধ্যাপনা করেন।এরপর যান মেলবোর্নে, গণিতে উচ্চতর পড়াশুনা করতে। ফিরে এসে যোগ দেন করাচী বিশ্ববিদ্যালয়ে। ১৯৬৭ সালে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগ দেন। এরপর এলো ১৯৭১। একাত্তরের মার্চের শেষের দিকে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে জোহা হলে ঘাঁটি গাড়ে পাকিস্তানী সামরিক পশুগুলো্। পুরো বিশ্ববিদ্যালয় হয়ে ওঠে হিংস্র পাকিস্তানী সেনাদের নির্মম নৃশংতার কেন্দ্র। ভয়াবহ নির্যাতনের শিকার হয়ে মারা যান কয়েকজন শিক্ষক ও ছাত্র। এপ্রিলের মাঝামঝি অনেকে ক্যাম্পাস ছেড়ে পালিয়ে যান। সহকর্মীরা পরামর্শ দেন মজিবর রহমানকেও তাদের সাথে ইন্ডিয়া পালিয়ে যাওয়ার জন্য। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসন তখন চলছে সেনাদের নিয়ন্ত্রণে। মজিবর রহমান থেকে গেলেন জুবেরী হাউসে।তিনি ইন্ডিয়া গেলেন না। মে মাসের ১০ তারিখে তিনি সেনা অবরুদ্ধ বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষকে একটি চিঠি লিখলেন । ইংরেজী তে টাইপ করা তাঁর সেই চিঠির সারমর্ম হলো-এই বিশ্ববিদ্যালয় একটি মিলিটারী ক্যাম্পে পরিণত হওয়ায় তিনি এই ক্যাম্পাস ত্যাগ করতে চান। অবরুদ্ধ এই বিশ্ববিদ্যালয় যখন মুক্ত হবে, যখন এটি তার স্বাভাবিক কর্মকান্ডে ফিরে যাবে তখন তিনি আবার ফিরে আসবেন। দু্র্যোগ আর গণহত্যার(চিঠির ভাষায় CALAMITY AND GENOCIDE) এই সময়টি তিনি তাঁর নিজ গ্রামে কাটাতে চান, অফিসিয়ালী যেটি তাঁর স্থায়ী ঠিকানা। চিঠির শেষে তিনি লিখলেন, আজ থেকে তিনি নতুন নামে পরিচিত হতে চান। আজ থেকে তাঁর নাম ‘দেবদাস’ ।এই নামেই তাঁর সাথে চলবে পরবর্তী যোগাযোগ। এরপর নিজের নাম সাইন করেন- ডি.দাস। ব্র্যাকেটে লেখেন DEVDAS, PREVIOUS NAME MOJIBOR RAHMAN।
একজন নিভৃতচারী আপাত নির্লিপ্ত মানুষের কি সাংঘাতিক সরব এক প্রতিবাদ! হিংস্র আর রক্তাক্ত সময়ের মুখোমুখি দাঁড়িয়ে কি অসাধারণ দৃপ্ত অবস্থান নেন নিঃসঙ্গ মজিবর রহমান অথবা দেবদাস!
পরে রাজশাহী থেকে তাঁকে নিয়ে যাওয়া হয় নাটোর জেলে। দীর্ঘ অকথ্য নির্যাতন শেষে ৫ সেপ্টেম্বর তিনি নাটোর কারাগার থেকে মুক্তি পান।এরপর ফিরে গেলেন অধ্যাপক দেবদাস তাঁর নিজস্ব ঠিকানায়, জয়পুরহাটের মহুরুল গ্রামে। অধ্যাপক দ্বিজেন শর্মা দ্বিজেন শর্মা ১৯২৯ সালের ২৯ মে সিলেট বিভাগের [তৎকালীন] বড়লেখা থানার শিমুলিয়া গ্রামে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতার নাম ভিষক চন্দ্রকাণ্ড শর্মা এবং মাতার নাম মগ্নময়ী দেবী। বাবা ভিষক বা গ্রাম্যভাষায় কবিরাজ ছিলেন, আর মা ছিলেন সমাজসেবী। শৈশবে মনের অজান্তে দ্বিজেন শর্মাও প্রকৃতির প্রেমে পড়ে গিয়েছিলেন।শৈশবেই গ্রামের পাঠশালায় তাঁর হাতেখড়ি হয়। তারপর করিমগঞ্জ পাবলিক হাইস্কুলে লেখাপড়া করেছেন। যদিও মায়ের ইচ্ছে ছিল তিনি বড় হয়ে ডাক্তার হবেন, কিন্তু প্রকৃতিপ্রেম তাঁকে উদ্ভিদবিদ হতে আকৃষ্ট করে। আর তাই কলকাতা সিটি কলেজে স্নাতক ডিগ্রি লাভের পর তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে উদ্ভিদবিজ্ঞানে স্নাতকোত্তর (১৯৫৮) ডিগ্রি লাভ করেন।
১৯৫৮ সালে বরিশালের ব্রজমোহন কলেজে শিক্ষক হিসেবে যোগ দেন

দ্বিজেন শর্মা। ১৯৬২ সাল পর্যন্ত সেখানেই কর্মরত ছিলেন। তারপর শিক্ষকতা শুরু করেন ঢাকাস্থ নটর ডেম কলেজে। ১৯৭৪ সালে সোভিয়েত প্রকাশনা সংস্থা প্রগতি প্রকাশনের অনুবাদকের চাকরি নিয়ে চলে যান মস্কো। তিনি চল্লিশটিরও বেশি বই অনুবাদ করেছেন। ১৯৯১ সালের এপ্রিল মাসে অনুবাদ বন্ধ করার নির্দেশ পাওয়ার পর রাশিয়ার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক সব সম্পর্ক চুকে গিয়েছিল। কিন্তু ১৭ বছরের প্রবাস জীবনকে মন থেকে মুছে ফেলতে পারেননি তিনি।
দ্বিজেন শর্মা তাঁর অবদানের কারণে বিভিন্ন সময় সংবর্ধিত হয়েছেন বিভিন্ন সংস্থা থেকে। পেয়েছেন বহু পুরস্কার। তাঁর প্রাপ্ত পুরস্কারের মধ্যে উল্লেখযোগ্য হলো ড. কুদরত-এ খুদা স্বর্ণপদক, বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার। অন্যান্য পুরস্কারের মধ্যে রয়েছে এম নুরুল কাদের শিশু-সাহিত্য পুরস্কার এবং ২০০১ সালে পাওয়া চ্যানেল আই প্রবর্তিত প্রকৃত সংরক্ষণ পদক। এছাড়াও তিনি বাংলাদেশ এশিয়াটিক সোসাইটি প্রকাশিত বাংলাপিডিয়া’র জীববিদ্যা বিভাগের অনুবাদক এবং সম্পাদক (২০০১- ২০০৩) হিসেবে দায়িত্ব পান, এবং তিনি বাংলা একাডেমীর একজন সম্মানিত ফেলো।
মুহম্মদ নূরুল হুদা: মুহম্মদ নূরুল হুদা কক্সবাজারের পোকখালী গ্রামে ৩০ সেপ্টেম্বর ১৯৪৯ সালে জন্ম গ্রহণ করেন।
মূলত কবি। তবে কথাসাহিত্য, মননশীল রচনা, অনুবাদ, লোকসাহিত্য, মেধাস্বত্ব ইত্যাদি বিচিত্র বিষয়ে লেখেন। প্রকাশিত গ্রন্থ-সংখ্যা শতাধিক। তিনি বাংলা একাডেমীর ফেলো, জেনেভাস্থ ওয়াইপো-র কনসালট্যাণ্ট, আমেরিকান ফোকলোর সোসাইটি, আই.এস.এফ.এন.আর, এশিয়াটিক সোসাইটিসহ অনেক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের সম্মানিত সদস্য। তাঁর কবিতা বিশ্বের নানাভাষায় অনূদিত। শিল্প-সাহিত্য ও সৃষ্টিশীলতার প্রয়োজনে তিনি সফর করেছেন পৃথিবীর নানা দেশ ও প্রান্ত। কর্মের স্বীকৃতি স্বরূপ পেয়েছেন প্রায় অর্ধশত পুরস্কার ও সম্মাননা। তার মধ্যে উল্লেখযোগ্য : আলাওল পুরস্কার (১৯৮৩), বাংলা একাডেমী সাহিত্য পুরস্কার (১৯৮৮), আহসান হাবীব কবিতা পুরস্কার (১৯৯৫), আইএসপি পয়েট অব ইন্টারন্যাশনাল মেরিট (যুক্তরাষ্ট্র), তুরস্কের প্রেসিডেন্ট সম্মাননা (১৯৯৬), নজরুল পুরস্কার (১৯৯৯, কোলকাতা), মহাদিগন্ত পুরস্কার (২০০৭, কোলকাতা), নগর-চাবি কক্সবাজার (২০০৯), রূপসী বাংলা জীবনানন্দ পুরস্কার (কোলকাতা, ২০১০), কারুভাষ বিনয়মজুমদার কবিতা পুরস্কার (২০১১, কোলকাতা), একুশ-ঊনিশের ভাষা গৌরব (২০১২, ত্রিপুরা) ইত্যাদি।
কুশলী সাহিত্য সংগঠক জনাব হুদা বর্তমানে বাংলাদেশ রাইটার্স ক্লাব ও নান্দনিক কবিতা-আন্দোলন কবিতাবংলা-র সভাপতি। তিনি দরিয়ানগর কবিতামেলা-র প্রবর্তক।
আব্দুর রহমান বয়াতি (মরণোত্তর) আব্দুর রহমান বয়াতী (জন্ম: ১৯৩৯ – মৃত্যু: ১৯ আগস্ট, ২০১৩) ছিলেন বাংলাদেশের একজন প্রসিদ্ধ লোকসঙ্গীত শিল্পী। তিনি একাধারে অসংখ্য জনপ্রিয় লোকগানের শিল্পী, গীতিকার, সুরকার এবং সঙ্গীত পরিচালক৷১৯৩৯ সালে ব্রিটিশ ভারতের ঢাকার সূত্রাপুর থানার দয়াগঞ্জে জন্মগ্রহণ করেন আবদুর রহমান বয়াতী। এ পর্যন্ত তার প্রায় পাঁচশ একক গানের অ্যালবাম বের হয়েছে। পাশাপাশি তিনটি মিশ্র অ্যালবামে গান গেয়েছেন তিনি। তার উল্লেখযোগ্য গানের মধ্যে রয়েছে।মন আমার দেহঘড়ি সন্ধান করি কোন মিস্তরি বানাইয়াছে’আমি ভুলি ভুলি মনে করি প্রাণে ধৈর্য্য মানে না’১৯ আগস্ট ২০১৩ সালে রাজধানীর ধানমন্ডির সাতমসজিদ রোডের জাপান-বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন
আবুল হায়াত দেশের সুখ্যাত অভিনেতা আবুল হায়াত। বেশ কিছু নাটকে নির্দেশনাও দিয়েছেন। লেখক হিসেবেও রয়েছে তার পরিচিতি। একুশের বইমেলায়ও নিয়মিত বই প্রকাশ করছেন তিনি।
১৯৮৯ সালে আবুল হায়াতের লেখা গল্পের বই ‘তৃষ্ণার শান্তি’ বইমেলায় প্রকাশিত হয়। এরপর ২৪ বছরে তিনি ২৩টি গল্পের বই পাঠককে উপহার দিয়েছেন। এবারে একুশের বইমেলায় প্রকাশ করলেন গল্পের বই ‘চোখ গেলো পাখি’। প্রকাশ করেছে শব্দশিল্প প্রকাশনী। এটি আবুল হায়াতের লেখা ২৩তম গল্পের বই। এবারের বইটির প্রচ্ছদ করেছেন আবুল হায়াতের মেয়ে অভিনেত্রী বিপাশা হায়াত। আবুল হায়াতের লেখা গল্পের বই ‘শোধ’ ও ‘একগুচ্ছ নিপোবনের জোকস’ গত বছরের বইমেলায় বাজারে আসে। এদিকে আবুল হায়াত এসএ হক অলিকের নির্দেশনায় ‘এক পৃথিবী প্রেম’ চলচ্চিত্রেও কাজ করছেন।
এটিএম শামসুজ্জামান :টিএম শামসুজ্জামানের পরিচয় একাধিক। তিনি একজন কাহিনীকার, সংলাপ রচয়িতা, চিত্রনাট্যকার, চলচ্চিত্র পরিচালক এবং অভিনেতা। সহকারী পরিচালক হিসেবে যাত্রা শুরু করে লেখক হিসেবে সুনাম অর্জন শেষে অভিনয়ে থিতু হন এটিএম শামসুজ্জামান, চলচ্চিত্র নির্মান কাজেও নিজেকে যুক্ত করেছেন বছর কয়েক আগে। ১৯৬১ সালে উদয়ন চৌধুরীর বিষকন্যা চলচ্চিত্রে সহকারি পরিচালক হিসেবে কাজ করার সুযোগ পান এটিএম শামসুজ্জামান। ১৯৬৫ সালে সর্বপ্রথম চলচ্চিত্রের জন্য চিত্রনাট্য লিখেন। ছবির নাম জলছবি এবং এর পরিচালক ছিলেন এইচ আকবর। উল্লেখ্য এই চলচ্চিত্রের মাধ্যমেই অভিনেতা ফারুক যাত্রা শুরু করেন। এটিএম শামসুজ্জামান বিভিন্ন পরিচালকের সাথে সহকারী হিসেবে কাজ করেন। এদের মধ্যে খান আতাউর রহমান, কাজী জহির, সুভাষ দত্ত অন্যতম। ১৯৬৫ সাল থেকে চলচ্চিত্রে অভিনয় শুরু করেন। প্রথম অভিনীত ছবি ‘ন্যায়ী জিন্দেগী’ যা শেষ পর্যন্ত সমাপ্ত হয় নি। এসময় তিনি ছোটখাটো চরিত্রে অভিনয় করতেন। ১৯৭৪ সালে তিনি আমজাদ হোসেন পরিচালিত চলচ্চিত্র ‘নয়নমনি’তে অভিনয়ের সুযোগ পান। মন্দলোকের চরিত্রে অভিনয় করে এটিএম শামসুজ্জামান তার অভিনয় জীবনের টার্নিং পয়েন্টে পৌছে যান, ছবিটিও দর্শকপ্রিয়তা পায়। ফলে পরিচালকরাও তাকে একের পর এক খলনায়ক চরিত্রে কাস্ট করতে লাগলেন। টাইপড হয়ে যাচ্ছেন এমন আশংকা থেকে অভিনয়ে বৈচিত্র নিয়ে আসার চেষ্টা করেন এটিএম শামসুজ্জামান। মন্দলোকের পাশাপাশি কৌতুক অভিনেতা হিসেবেও অভিনয় করতে শুরু করেন এবং এখানেও সফল হন। তার পরিচালনার প্রথম ছবি ‘এবাদত’। ২০০৬ সালে চলচ্চিত্রটি মুক্তি পায়। চলচ্চিত্রটি মোটামুটি দর্শকপ্রিয়তা লাভ করলেও এটিএম শামসুজ্জামান আর কোন চলচ্চিত্র পরিচালনার কাজে হাত দেন নি। লেখালিখির অভিজ্ঞতা সম্পর্কে বলতে গিয়ে তিনি তার স্কুল জীবনের কথা উল্লেখ করেন। স্কুল ম্যাগাজিনে লেখার উদ্দেশ্যে তিনি ‘অবহেলা’ শিরোনামে একটি ছোটগল্প লিখেন যা কবি ফেরদৌসির একটি ঘটনা দ্বারা অনুপ্রাণিত ছিল। গল্পটি তিনি ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহকে দেখান। ডঃ শহীদুল্লাহ তার আত্মীয় ছিলেন। রনেশ দাশগুপ্ত তাকে বিভিন্ন সময়ে লেখার ব্যাপারে পরামর্শদাতা হিসেবে ভূমিকা পালন করেছেন।
আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া
আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়া বাংলাদেশের একজন স্বনামধন্য সৌখিন পুরাতাত্ত্বিক, গবেষক, প্রাচীন পুঁথি সংগ্রাহক এবং প্রত্নবস্তু সংগঠক।গ্রন্থকার আবুল কালাম মোহাম্মদ যাকারিয়ার পৈত্রিক নিবাস ব্রাহ্মণবাড়িয়া জেলার দরিকান্দ গ্রামে। তিনি ১৯১৮ সালের ১লা অক্টোবর জন্মগ্রহণ করেন একই উপজেলার ভেলানতা গ্রামের বড় বাড়িতে তাঁর মাতুলালয়ে।অসাধারণ মেধার অধিকারী জনাব যাকারিয়া কৃতিত্বের সঙ্গে শিক্ষাজীবন সমাপ্ত করে বেশ কিছুদিন বগুড়া আজিজুল হক কলেজে ইংরেজি ভাষা ও সাহিত্যে অধ্যাপনার কাজ করে ইংরেজ আমলের শেষ বর্ষে প্রতিযোগিতামূলক পরীক্ষার মাধ্যমে ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেটের চাকুরি লাভ করেন এবং ধাপে ধাপে পদোন্নতি লাভ করে বাংলাদেশ সরকারের শিক্ষা, সংস্কৃতি ও ক্রীড়া মন্ত্রকের সচিবের পদ থেকে অবসর লাভ করেন।বহুমুখি প্রতিভা ও অসাধারণ পাণ্ডিত্যের অধিকারী জনাব যাকারিয়ার বিচরণ প্রত্নতত্ত্ব, নৃতত্ত্ব, ইতিহাস, মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্য, মূল ফারসি থেকে অনুবাদ, বাংলা কবিতা ইত্যাদি বহু ক্ষেত্রে এবং সর্বত্রই তিনি তাঁর অসাধারণ প্রতিভার স্বাক্ষর রেখেছেন।এ পর্যন্ত তাঁর প্রকাশিত গ্রন্থের সংখ্যা ৩০। তিনি তাঁর এই বহুল কর্মময় জীবন পার করে এলেও বাংলার ইতিহাসে তিনি স্মরণীয় হয়ে আছেন তার সৌখিন কার্যকলাপের কারণে। এমনকি তাঁর এসব সৌখিন কার্যকলাপ ঐ পেশার পেশাদারী ব্যক্তিত্বের চেয়েও সমৃদ্ধ। তাঁর এসব সৌখিন কার্যকলাপের কারণেই আজ বাংলাদেশের পুরাতত্ত্বের ইতিহাসে সীতাকোট বিহার নামটি যুক্ত হয়েছে। তাঁরই প্রচেষ্ঠায় প্রতিষ্ঠিত হয়েছে বাংলাদেশের তৃতীয় বৃহত্তম জাদুঘর দিনাজপুর মিউজিয়াম। তাঁরই ব্যক্তিগত উদ্যোগে সংগৃহীত হয়েছে প্রাচীন দুর্লভ অনেক পুথিঁ। এছাড়াও রেখে গেছেন নিজের এক বিপুল সংগ্রহশালা, যেখানে স্থান পেয়েছে অনেক দুর্লভ পুস্তকসহ ছোটখাটো প্রত্নসামগ্রী।
কামাল লোহানী
কামাল লোহানী বাংলাদেশের প্রখ্যাত সাংবাদিক। কামাল লোহানী নামেই পরিচিত হলেও তাঁর পারিবারিক নাম আবু নঈম মোহাম্মদ মোস্তফা কামাল খান লোহানী।কামাল লোহানীর জন্ম সিরাজগঞ্জের উল্লাপাড়া থানার সনতলা গ্রামে। বাবা আবু ইউসুফ মোহাম্মদ মুসা খান লোহানী। মা রোকেয়া খান লোহানী।
কামাল লোহানী প্রথমে কলকাতার শিশু বিদ্যাপীঠে পড়াশুনা শুরু করেন। দেশভাগের পর ১৯৪৮ সালে পাবনা চলে যান। ভর্তি হলেন পাবনা জিলা স্কুলে। ১৯৫২ সালে মাধ্যমিক পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন। এরপর ভর্তি হন পাবনা এডওয়ার্ড কলেজে। এই কলেজ থেকেই উচ্চমাধ্যমিক পাস করেন। আর উচ্চমাধ্যমিক পাস করার পরই প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি টানেন তিনি।
কামাল লোহানী ‘দৈনিক আজাদ’, ‘দৈনিক সংবাদ’, ‘দৈনিক পূর্বদেশ’, ‘দৈনিক বার্তা’সহ বিভিন্ন পত্রিকার বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ পদে কর্মরত ছিলেন। তিনি সাংবাদিক ইউনিয়নে দু’দফায় যুগ্ম-সম্পাদক এবং ঢাকা সাংবাদিক ইউনিয়নের সভাপতি হন। তিনি গণশিল্পী সংস্থার সভাপতি হন। তিনি উদীচী শিল্পী গোষ্ঠী, একাত্তরের ঘাতক-দালাল নির্মূল কমিটি ও সম্মিলিত সাংস্কৃতিক জোটেরও উপদেষ্টা। ১৯৬২ সালে স্বল্পকাল কারাবাসের পর কামাল লোহানী ‘ছায়ানট’ সাংস্কৃতিক সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক হিসেবে দায়িত্ব গ্রহণ করেন। সাড়ে চার বছর এই দায়িত্ব পালন করেন। এরপর মার্কসবাদী আদর্শে ১৯৬৭ সালে গড়ে তোলেন ‘ক্রান্তি’। দুই দফায় তিনি শিল্পকলা একাডেমীর মহাপরিচালকের দায়িত্ব পালন করেছেন।
ফরিদুর রেজা সাগর
ফরিদুর রেজা সাগরের জন্ম ২২ ফেব্রুয়ারি, ১৯৫৫। শিশু সাহিত্যিক ও মিডিয়া ব্যক্তিত্ব হিসেবে তার খ্যাতি দু’দশকেরও বেশী সময় ধরে। বাংলাদেশ টেলিভিশনের জন্মলগ্ন থেকেই তিনি বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সঙ্গে জড়িত ছিলেন। টিভি অনুষ্ঠান উপস্থাপনার পাশাপাশি তার লেখা বেশ কয়েকটি নাটকও টেলিভিশনে প্রচারিত হয়েছে। প্রায় সারা জীবনই তিনি টেলিভিশনের সঙ্গে জড়িত রয়েছেন। বর্তমানে তিনি ইমপ্রেস টেলিফিল্ম লিমিটেড, চ্যানেল আই’র ব্যবস্থাপনা পরিচালকের দায়িত্বের পাশাপাশি নিজেকে লেখালেখিতে সম্পৃক্ত রেখেছেন।
প্রায় শতাধিক গ্রন্থের লেখক ফরিদুর রেজা সাগরের লেখা ‘ছোট কাকু সিরিজ’ ছোট বড় সকলের কাছে সমান জনপ্রিয়তা পেয়েছে। বড়দের জন্যও লিখেছেন নানা ধরণের বই। ভ্রমণ বিষয়ক গ্রন্থ ‘ভ্রমণ ভ্রমিয়া শেষে’ ছাড়াও বাংলাদেশের টেলিভিশন ব্যবস্থা নিয়ে তথ্যভিত্তিক স্মৃতিকথামূলক গ্রন্থ ‘একজীবনে টেলিভিশন’, ‘টেলিভিশন জীবনের সঙ্গী’, টেলিভিশন আরেক জীবনে ও টেলিভিশন ভাবনা বই ৪‘টি ব্যাপকভাবে আলোচিত হয়েছে। তার লেখা ‘এক জীবনে টেলিভিশন’ বইটি চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগে পাঠ্যসূচীতে অন্তর্ভূক্ত করা হয়েছে। এছাড়া তার লেখা কিশোর সমগ্র গ্রন্থ বেরিয়েছে সাতটি।
ঝর্ণা ধারা চৌধুরী
বর্তমান লক্ষ্মীপুর জেলার রামগঞ্জ উপজেলার চন্ডিপুর ইউনিয়নের কালুপুর গ্রামের গান্ধীয়ান প্রথম চৌধুরী ও আশালতা চৌধুরীর ১১ সন্তানের মধ্যে দশম সন্তান ঝর্ণা ধারা চৌধুরীর জন্ম ১৯৩৮ সালের ১৫ অক্টোবর। মানবসেবার ব্রত নিয়ে বড় বোনের সাথে সংসার ছাড়েন ঝর্ণা ধারা চৌধুরী। ১৯৫৪ সালে বাবা মারা যাওায়ার পর ১৯৫৬ সালে যোগ দেন গান্ধীর প্রতিষ্ঠিত অম্বিকা কালিগঙ্গা চ্যারিটেবল ট্রাষ্টে (আজকের গান্ধী আশ্রম ট্রাষ্ট)। ১৯৬০ সালে বৃটিশ বিরোধী আন্দোলনে সংসারত্যাগীদের সংগঠন চট্টগ্রামের প্রবর্তক সংঘে যোগদানের মাধ্যমে সরাসরি মানবসেবা নিয়োজিত হন এই গান্ধী কর্মী। সমাজকর্মের পাশাপাশি তিনি পড়ালেখাও চালিয়ে নেন। তিনি চট্টগ্রামের খাস্তগীর বালিকা উচ্চবিদ্যালয় থেকে ম্যাট্রিকুলেশন, কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজ থেকে উচ্চমাধ্যমিক ও ঢাকা কলেজ থেকে স্নাতক পাস করেন। ১৯৭৯ সালে পুনরায় ফিরে আসেন গান্ধী আশ্রম ট্রাষ্টে। ১৯৯০ সালের ১৩ জুন মহাত্মা গান্ধীর সহচর চারু চৌধুরীর মৃত্যুর পর ট্রাষ্টের সচিবের দায়িত্ব পান ঝর্ণা ধারা চৌধুরী। সেই থেকেই তিনি আগলে রেখেছেন মানবসেবার অনন্য দৃষ্টান্ত স্থাপনকারী গান্ধী আশ্রম ট্রাষকে।
সমাজকর্মের স্বীকৃতি হিসাবে ১৯৯৮ সালে আন্তর্জাতিক ‘বাজাজ’ পুরস্কার (বাংলাদেশে একমাত্র প্রাপক) লাভ করেন। এছাড়া তিনি নারী উদ্যোক্তার স্বীকৃতি হিসেবে ২০০২ সালে ‘অনন্যা’ পুরস্কার, সমাজসেবার জন্য ২০০৩ সালে নারীপক্ষ দুর্বার নেটওয়ার্ক, নিউইয়কেৃর ওল্ড ওয়েস্টবেরি ইউনিভার্সিটির শান্তি পুরস্কার, শান্তি, সম্প্রীতি ও অহিংসা প্রসারে ভূমিকার স্বীকৃতি স্বরূপ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘শান্তি পুরস্কার’ লাভ করেছেন। নিঃস্বার্থভাবে সমাজসেবার স্বীকৃতি স্বরূপ ২০০৮ সালে নোয়াখালী জেলা প্রশাসন থেকে ‘সাদা মনের মানুষ’ হিসেবে তিনি সম্মানিত হয়েছেন। সমাজসেবায় নিঃস্বার্থ অবদানের স্বীকৃতি স্বরূপ শ্রীযুক্তা ঝর্ণাধারা চৌধুরীকে শ্রীচৈতন্য পদক ২০১০ প্রদান করা হয়েছে। সম্প্রতি তিনি চ্যানেল আই এবং রাধুনীর পক্ষ থেকে ”কীর্তিমতী নারী -২০১০” এবং ২০১১ সালে হরিয়ানা কর্তক ‘‘গান্ধী স্মৃতি শান্তি সদ্ভাবনা’’ পুরষ্কারে সম্মানিত হয়েছেন ।সর্বশেষ ভারতের রাষ্ট্রপতি প্রণব মূখার্জীর কাছ থেকে প্রথম বাংলাদেশী হিসাবে ভারত সরকারের সর্বোচ্ছ বেসামরিক পুরস্কার পদ্মশ্রী পুরস্কার গ্রহণ করেছেন আজীবন নির্লোভ সাদাসিদে জীবনের অধিকারীনি নোয়াখালীর সোনাইমুড়ি উপজেলা জয়াগ গ্রামের গান্ধী আশ্রম ট্রাষ্টের সচিব ঝর্ণা ধারা চৌধুরী।এছাড়া সমাজসেবায় শ্রীমৎ সত্যপ্রিয় মাথের ও অধ্যাপক ড. অরূপরতন চৌধুরী এবং শিক্ষায় অধ্যাপক ডা. এমএ মান্নান ও সনৎ কুমার সাহা একুশে পদক-২০১৫ জন্য মনোনীত হয়েছেন।